সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার, পুলিশের সংকট ও ফেব্রুয়ারি নির্বাচন: অনিশ্চিত সময়ের প্রতিচিত্র
গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে এক অস্বাভাবিক প্রশাসনিক বাস্তবতা গড়ে উঠেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সেনাবাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে রাখা—তার উপর “ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার” প্রদানের নিয়ে—দেশের সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোর স্বাভাবিক সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার প্রতিফলন হিসেবে ধরা দেয়।
সহিংসতার উত্তরাধিকার
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা দখলের সময় যে সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি এখনো থামেনি। চার শতাধিক থানায় হামলা, অসংখ্য পুলিশ সদস্য হত্যা, অস্ত্র লুট ও পুলিশকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাগুলো জাতীয় স্মৃতিতে গভীর দাগ রেখে গেছে। এসব ঘটনার পর অনেক পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে ফেরেননি; অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন; আবার যারা আছেন, তারা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।
ন্যায়সঙ্গত আইনানুগ ব্যবস্থা নিলেও যদি তা সরকারের স্বার্থবিরোধী হয়—তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও আছে। ফলত পুলিশ বাহিনী এখন আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ও পেশাগত দায়িত্বের দ্বন্দ্বে আটকে পড়েছে।
সেনাবাহিনীর অবস্থান ও আইসিটি মামলা
সেনাবাহিনীর জন্যও সময়টা মোটেই স্বস্তির নয়। প্রাক্তন সরকারের আমলে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে অভিযুক্ত যে সব ব্যক্তি আজ পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীন, তাদের প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরিরত ২৫ জন উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার নামে বিতর্কিতভাবে সংশোধিত “আইসিটি আইনে” মামলা করা হয়েছে। এ নিয়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে অদৃশ্য টানাপোরেন অনুমান করা যায়। এরই মধ্যে একজন প্রাক্তন উর্ধতন সেনা কর্মকর্তা, যিনি রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকান্ডের জন্য চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, উক্ত উক্ত ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার নামে মামলা করাতে তার পরোক্ষ হাত রয়েছে বলে নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। অনির্ভর সূত্রে জানা গেছে, আরও অন্তত ২০ জন উর্ধতন সেনা কর্মকর্তার নামে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে এটা সেনাবাহিনীর মর্যাদাহানী শুধু নয়, পুরো বাহিনীকে পুলিশের মতো দুর্বল করে দেয়ার একটা চক্রান্ত।
এই প্রেক্ষাপটে সেনা প্রত্যাহার ও বাহিনীর নীরবতা যেন এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে, যেন তারা এখন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়, স্থিতিশীলতার গ্যারান্টার হিসেবে নয়।
ক্ষুদে রাজনৈতিক সংগঠন ও অপমানের সংস্কৃতি
নবগঠিত কিছু ক্ষুদে রাজনৈতিক দলের তরুণ নেতৃত্ব সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অশোভন ও অপমানজনক বক্তব্য দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। ক্ষমতাসীনদের মদদে গঠিত এসব সংগঠন এখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও অর্ধ-সেনা প্রত্যাহারের রহস্য
সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—যখন দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত, তখন কেন হঠাৎ করে ৫০ শতাংশ সেনা সদস্যকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে? এটি কি নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক হিসাব লুকিয়ে আছে?
দেড় বছর মাঠে থাকা সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার একটি প্রধান স্তম্ভ। এখন সেই সেনা উপস্থিতি কমিয়ে আনা—যে সময়ে পুলিশ বাহিনী দুর্বল, প্রশাসন বিভক্ত এবং জনগণের আস্থা নড়বড়ে—তা নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
উপসংহার
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের ছায়া। পুলিশ বাহিনী নিরাপত্তাহীন, সেনাবাহিনী সন্দেহে ঘেরা এবং প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন ভেঙে পড়তে পারে, তেমনি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ, সরকারের খামখেয়ালিপনায় দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল, যারা দেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছিলো, তাদেরকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা বালখিল্যতা ও দুঃসাহসিক চিন্তা ছাড়া কিছু না।
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা শুধু সেনা বা পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতিতে আসে না; আসে ন্যায়, জবাবদিহি ও আস্থার পুনর্গঠনে। সেটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।








Leave a Reply